এপয়েন্টমেন্ট লেটার

আমার হাতে এখন আমার প্রথম চাকরির এপয়েন্টমেন্ট লেটার। মামা, চাচা, খালু বা কোনো লিংকের জোড়ে নয়, বরং নিজের যোগ্যতায় পাওয়া প্রথম চাকরির এপয়েন্টমেন্ট লেটার। আমি আমার লাইফে এই পর্যন্ত একটি ইন্টারভিউই দিয়েছি। এবং প্রথম ইন্টারভিউতেই আমার চাকরিটা হয়েছে। আমি জানি না, এরকম ভাগ্য নিয়ে সবাই পৃথিবীতে আসে কিনা। তবে আমি এসেছি … এই সৌভাগ্য কয়জনের হয় আমার জানা নেই। তবে আমি সত্যিই সৌভাগ্যবান। হয়তোবা অনেকের দোয়া আছে আমার উপর, কিন্তু আমি ওসব বিশ্বাস করি না। আমি আমার জীবনে এমন কিছুই করিনি যে এতোটাই দোয়া পাবো।

এই চাকরিটার জন্য আমার মোট দুইবার ইন্টার্ভিউ দিতে হয়েছে। ভার্সিটির জব ফেয়ারের শেষ দিন আমি জানতে পারলাম, ২৫ টার মতো নামিদামী কোম্পানি এসেছে। সেদিনই ছিলো সিভি জমা দেওয়ার শেষ দিন। আর তখনো আমার নিজস্ব কোন সিভি বানানো ছিলো না। আমি আসলে জানতামই না, ভার্সিটিতে যে জব ফেয়ার চলছে। যখন জানতে পারলাম, তখন বাজছিল ১১.৩০। সিভি জমা দেওয়ার শেষ সময় বিকাল ৪ টা। আমার সদ্য ফরমাল ড্রেসে পড়া কোন ছবি তোলা ছিলো না, যে দুই কপি তোলা আছে তা ইন্টার পাস করার পর টি -শার্ট পড়া অবস্থায় তোলা। আর তা ও সাথে নেই, আছে বোনের বাসায়। সিভিও করা নেই। ১২ থেকে ৩ টা পর্যন্ত ক্লাস। আর রগ কাটার কারণে বাম হাত প্লাস্টার করা অবস্থায় গলায় ঝুলানো….

আমি আমার সিভি তৌরি করেছিলাম ৪ টা বাজার ৪০ মিনিট আগে … টি শার্ট পড়ে তোলা পাসপোর্ট সাইজের ছবি সংবলিত ২৫ কপি সিভি প্রিন্ট করতে করতে বেজে গিয়েছিল ৩ টা ৫০। তারপর প্লাস্টার করা হাত নিয়ে দৌড় … পিছন থেকে শুনলাম কে যেন বলে উঠলো, “Run Forest, Run…” মনের ভুলও হতে পারে …

দেড়িতে সিভি জমা দেওয়ার কারণে হোক, CGPA কম থাকার কারণে হোক, বা টি শার্ট পড়ে তোলা পাসপোর্ট সাইজের ছবির থাকার কারণেই হোক … আমাকে মাত্র একটি কম্পানি থেকে কল করা হলো। বলা হলো তারপরের দিন ইন্টার্ভিউ। আমি ডাক্তারের নিষেধ থাকা স্বত্বেও প্লাস্টার খুলে গিয়েছিলাম ইন্টার্ভিউতে। বাম হাত নাড়াচাড়া করতে পারছিলাম না রগ টান খাওয়ার কারণে। তারপরও তিন ঘন্টা চুপচাপ বসে ছিলাম প্রথম ইন্টার্ভিউ দেওয়ার জন্য … বা চাকরিটা পাবার আশায় …

ঐ কোম্পানি আমাদের ভার্সিটি থেকে মাত্র ৮ জন সিলেক্ট করেছিল প্রথম ইন্টার্ভিউয়ের জন্য। এক এক জনের ইন্টার্ভিউ নিচ্ছিল ১৫ মিনিট করে। আমি ছিলাম সবার শেষে .. আমিও দিয়েছিলাম… আমাকে ইন্টারভিউ শেষে বলা হয়েছিল, “আরেকটা ফাইনাল ইন্টার্ভিউয়ের জন্য হয়তোবা আপনাকে ডাকা হতে পারে, আপনি আসতে পারবেন তো? “
আমি বলেছিলাম, “অবশ্যই স্যার, আমি আপনাদের কলের অপেক্ষায় থাকবো “
আমি অপেক্ষায় থাকিনি। ১৫ দিনের মতো অপেক্ষায় থাকার পর আমি হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম একেবারেই। বাপের পরিচয়ের লিঙ্ক ধরে ঔষুধ কোম্পানিতে ঢুকার একটা অফারও পেয়েছিলাম। মন একেবারেই টানছিল না, কিন্তু সবার একটাই কথা ..”এই যুগে লিংক ছাড়া চাকরি প্রধানমন্ত্রীও নাকি পায় না “। আর আমি কোন … … আবদুল্লাহ?

প্রথম ইন্টার্ভিউয়ের ঠিক এক মাস ৫ দিন পর ১৪ তারিখ সন্ধ্যায় সেই অনাকাঙ্ক্ষিত কলটি এসেছিল। আমাকে বলা হলো, ১৬ তারিখ ফাইনাল ইন্টার্ভউয়ের জন্য আমাকে সিলেক্ট করা হয়েছে। ইন্টার্ভিউয়ের দিন যেয়ে দেখলাম ৪ টা টপ অর্ডারের ভার্সিটি থেকে মাত্র ৯ জনের মতো সিলেক্ট করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪ জন শুধুমাত্র আমাদের ভার্সিটিরই!! গর্ব করার মতোই জিনিস, তবে গর্ভের চাইতে যেটা বেশী কাজ করছিল, সেটা হলো ‘ভয় ‘। কারণ বাকি তিন জনের মধ্যে ২ জনই আমার পরিচিত ছিলো। একজনের সিজিপিএ ছিলো ৩.৫ এর উপরে আর একজন ছিল এক স্যারের টি.এ। আর একজন যে ছিল, সে ছিল ‘রেডিও আমার’ এর প্রাক্তন R.J.। আর আমি আবুল T.A ও ছিলাম না, আবার R.J ও না। আর আমার সিজিপিএ না হয় আপনাদের না ই বললাম। শুধু এতোটুকু বলি তাদের তুলনায় অনেক অনেক কম। কিন্তু আমার একটি জিনিস হয়তোবা তাদের চাইতে অনেক বেশী ছিলো, আর তা হচ্ছে ‘আত্মবিশ্বাস ‘। আর আজকে হয়তো সেই আত্মবিশ্বাসের কারণেই আমার হাতে আমার প্রথম চাকরির এপয়েন্টমেন্ট লেটার …. কিংবা তথাকথিত ভাগ্যের জোড়ে।

সামনের মাসের ২ তারিখে আমার জয়েনিং ডেট। আপনাদের কাছ দোয়া চাই। চাকরিতে টিকে থাকার দোয়া না, বরং আত্মবিশ্বাস থেকে যেন কখনো ছিটকে না যাই তার দোয়া।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s