দাগ…

শ্রধ্যেয় জনাব,
পত্রের শুরুতেই আমার নমষ্কার জ্ঞাপন করছি। আমি জানি না আমার পত্র আপনি ‘বেয়াদবী ‘হিসেবে নিচ্ছেন কিনা। তবে আমি আপনার প্রতি আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা নিয়ে লিখতে বসেছি।
আমি জানি আমার প্রতি আপনার প্রচন্ড ক্ষোভ রয়েছে। থাকাটাই স্বাভাবিক। আমি আপনার জায়গায় থাকলে আমারও থাকতো। তবে আমি এটাও জানি, আমার থেকে বেশী ক্ষোভ আপনি আপনার মেয়ের প্রতি রয়েছে। সেই ছোট বেলা থেকে আপনি যাকে এতো বড় করেছেন তার প্রতি আপনার ভালোবাসার অধিকার যেমন আছে, তেমনি ক্ষোভ পোষণ করারও। আমি জানি আমরা যেই কাজটি আপনাদের অগোচরে ৬ টি বছর ধরে করে এসেছিলাম তা আপনার মনে একটি বড়সর দাগ কেটেছে। আপনার এই দাগের কথা বুঝতে পেরেই কিন্তু আপনার মেয়ে তা মুছার জন্য আমার সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আপনার দাগের কথা ভেবেই কিন্তু সে আমার কাছে আসার বদলে ফিরে গিয়েছে আপনাদের কাছেই। শুধুমাত্র আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে সে চুপচাপ সব মেনে নিয়েছে। আজ যদি সে আজ আপনাদের কথা না ভেবে আমার কাছে চলে আসতো, সে কোনোদিনই হয়তোবা নিজেকে ক্ষমা করতে পারতো না। আপনি কি পারবেন, আপনাকে ক্ষমা করতে? আপনি হয়তো ভাবছেন, আপনি কেন ক্ষমা চাইবেন নিজের কাছে, আপনি কি করেছেন! আপনি হয়তোবা কখনোই ধরতে পারবেন না আপনার দাগ মুছতে যেয়ে সবার অগোচরে যে আপনার মেয়ের ভিতরে একটি বড়সড় দাগ কেটে যাচ্ছে দিন দিন। ও যতদিন বেচেঁ থাকবে ততদিনই এই দাগটি তার সাথে থাকবে। আপনি যদি কখনো ওকে ভালোভাবে লক্ষ্য করেন আপনি সেই দাগটি অস্পষ্টভাবে দেখতে পারবেন। আমি জানি ঠিক সেই মূহুর্তে আপনি সেই দাগের ব্যথা কিছুটা হলেও বুঝতে পারবেন। আপনি সেই ব্যথাটি সহ্য করতে পারবেন কিনা জানিনা … কিন্তু এই ব্যাথাটাই আপনার মেয়েকে তার বাকিটা জীবন হাসি মুখে সহ্য করে যেতে হবে। আপনার মেয়ে প্রায়ই আমাকে বলতো আপনার কথা। আপনার সাথে তার ছোটবেলার হুন্ডায় চড়ার কথা, কিনবা ওই দিনটির কথা যেদিন আপনি ওকে মেলায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ও যখন ওইসব কথা বলতো, ও থামতেই চাইতোনা … ওর চোখে মুখে আমি সেই সময়ের অনূভুতিগুলো দেখতে পেতাম। ও আপনাকে ভীষণ ভালবাসে… যেই ভালবাসা থেকে ও হয়তো নিজের সবকিছুই বিলিয়ে দিতে পারে.. কিন্তু ওর একটি ভুলের জন্য তা হয়তো আপনার কখনোই চোখে পড়বে না … চোখে পড়বে তার ভিতরের দাগটিও। কারণ আপনার দাঁড়িপাল্লায় আপনার মান সন্মান এর ওজন অনেক বেশী। যেই ওজনের চাপে একটা দাগ কিছুই না।
প্রাচীন সময়কাল থেকে আজকের বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে ৭ টি পাপের কথা বলা হয়েছে। যেসব পাপের ফল নাকি মানুষরা ইহলোকেই ভোগ করে থাকে। সেই ৭ টি পাপের একটি হচ্ছে ‘Pride’, যার অর্থ হচ্ছে অহংকার বা আত্মাভিমান। আর আত্মাভিমানের জন্ম হয় ‘মান সন্মান ‘ হারানোর ভয় থেকে। আমি জানিনা আপনি কত বছর বাঁচবেন, বা আমি কত বছর বাঁচবো। তবে আমার দেখার খুব ইচ্ছা আপনি মৃত্যুর ঠিক আগ মূহুর্তে আপনার মেয়ের দিকে তাকিয়ে কি চিন্তা করেন। আমি জানি আপনার মেয়ে সেদিন মন খুলে দৃঢ় চিত্তে কাদতেঁ পারবে এই ভেবে যে, সে আপনার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আপনার প্রতিটি ইচ্ছার, প্রতিটি কথার, প্রতিটি আবেগের গুরুত্ব দিয়েছে। এই ভেবে আপনিও হয়তোবা একজন স্বার্থপরের মতো হাসিমুখে মৃত্যুবরণ করতে পারেন, অথবা একটি সূক্ষ দুঃখ নিয়ে … আর যদি আপনার মেয়ের মৃত্যু আগে হয়, সেদিনও সে দৃঢ় চিত্তে মৃত্যুকে এই ভেবে গ্রহণ করতে পারবে যে, সে কোনোদিনও আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করেনি। আর আপনি সেদিনও খুতখুত মনে দাড়িয়ে থাকবেন তার পাশে … চেষ্টা করবেন আপনার খুতখুতের বিষয়টা ধরার জন্য। আমি আপনার যায়গায় থাকলে চেষ্টা করতাম, তার চিতার আগুন থেকে তার দাগটাকে খুজেঁ বের করার। যেই দাগ একটি মেয়ে তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আঁকড়ে ধরে রেখেছিল হাসিমুখে। কাউকেই বুঝতে দেইনি কখনো … কাউকেই না…
………………………..
তন্দ্রা তোমার মতো একটি মেয়ের সাথে আমার ৬ বছর সম্পর্ক ছিল এটি ভাবতেও আমার গর্ব হয়। তোমার প্রতিটি ইচ্ছা আমি অবশ্যই পূরণের চেষ্টা করবো। আমি কখনোই থেমে যাবো না মাঝ পথে … কখনোই না…
Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s