একজন সেলিম স্যার…ও আমার চতুরঙ্গ আসক্তি

আমি দাবা খেলতে অসম্ভব ভালোবাসি, তবে তা অবশ্যই আমার থেকে ভালো প্লেয়ারদের সাথে। অনেক কিছু শিখা যায় দাবা খেলার প্রতিটা চালে। তবে যতোটা না শিখা যায়, তার থেকে বেশী বুঝা যায় অপর পাশে থাকা মানুষটি সম্পর্কে। তার দৈনন্দিন জীবণের চাল চলন, অভ্যাস, স্ট্রেস নেওয়ার ক্ষমতা, স্ট্রেস দেওয়ার ক্ষমতা, টেম্পার লেভেল… আরো অনেক কিছুই বুঝা যায়,  যদি কিনা আপনি একটু ভালোভাবে খেয়াল করেন।

আমি অনেক দিন হলো ‘সত্যিকার অর্থে’ দাবা খেলি না। ‘সতিক্যার অর্থে’ বলতে বুঝিয়েছি ‘সত্যিকার অর্থে’, অর্থাৎ ৩২ টি দাবার ঘুটি আর একটি দাবার বোর্ড নিয়ে আমার এখন খেলতে বসা হয়ে উঠে না আর। হয়ে উঠে না কারণ খেলার মতো কোনো পার্টনার খুজে পাই না আর। তবে আমার খেলার প্রচন্ড ইচ্ছে সব সময়ই করে, এবং আমি খেলিও। কিভাবে খেলি তার ব্যাখ্যা পরে করি, আগে বলি আমার দাবার প্রতি আসক্তির কথা। আমি দাবার প্রতি এতটাই আসক্ত যে, প্রতিদিন রাতে অফিস থেকে কাওরান বাজার রেললাইন ধরে হেটে আসার সময় দেখি একজোড়া মধ্যবয়সী খেটে খাওয়া দিনমুজুরেরা দাবা খেলতেছে… আর আমিও প্রতিদিন ঐ যায়গাতে এসে দাঁড়িয়ে যাই। আশ পাশের ভিড় ঠেলে কোনো রকমে দেখার চেষ্টা করি কার কি অবস্থান। তার থেকেও বেশী দেখি তাদের এক্সপ্রেশন। ওদের এক্সপ্রেশন গুলো হয় একেবারেই প্রাকৃতিক, যখন যা অনূভব করছে তা ই প্রকাশ করছে গালিতে, মাঝে মাঝে নিজের উপর জেদ করে, মাঝে মাঝে দাবার গুটির উপর জেদ করে, আর বেশীরভাগ সময় প্রতিপক্ষের উপর জেদ করে। তবে খেয়াল করার মতো বিষয় হচ্ছে, এই ধরণের এক্সপ্রেশন আপনি শিক্ষিতদের খেলার সময় দেখবেন না। তাই আমি শিক্ষিতদের খেলা দেখিও না। নিজের ভিতরে আটকিয়ে রাখা অভিব্যাক্তি জোড় করে খুঁজতে যাওয়ার কোনো মানে আমি দেখি না। তাই খুঁজতে যাইও না। আমি দেখি আমার মতো নিন্মবিত্তের দাবা খেলা… ততোক্ষণ, যতক্ষণ না আমার ঘড়ি আমাকে জানান দেয় বাসায় যাওয়ার জন্য।

আবার কেউ যদি আমাকে রাত ২ টার দিকে গভীর ঘুম থেকে তুলে বলে দাবা খেলার জন্য… আমি কোনো কথা না বাড়িয়ে চোখ ধুয়ে দাবার বোর্ড সাজানো শুরু করবো। তবে শর্ত একটাই, আর তা হচ্ছে প্রতিপক্ষ হতে হবে রক্ত মাংসের মানুষ। কোনো AI হলে চলবে না। কারণ আমি কম্পিউটারের সাথে খেলে কখনোই মজা পাই না, তাই খেলিও না। কারণ কম্পিউটারের সাথে খেলার সময় আমি প্রতিপক্ষের অভিব্যাক্তি দেখার কোনো সুযোগ পাই না। একজন প্রতিপক্ষ যে সে ঘোড়া হারলে কি রকম অনূভব করে, বা একটা রথ হারালে কি রকম অনূভব করে, তা ই যদি দেখতে না পারি তাহলে সেই দাবা খেলা আর সাপ লুডু খেলার মধ্যে আমি কোনো পার্থক্য দেখি না। খেলতে হবে টান টান উত্তেজনায়… প্রতিপক্ষের শুধু পূর্ববর্তী চাল দেখেই নয়, বরং প্রতিপক্ষের চোখ এবং অভিব্যাক্তি দেখে বুঝতে হবে তার পরবর্তী চাল কি হতে যাচ্ছে। আর তা আপনি বুঝতে পারবেন একজন প্রতিপক্ষের প্রতিটা চালের সময়, ধরণ, স্ট্রেটেজি এবং বিভিন্ন গুটির প্রতি তার ভালোবাসা দেখে আপনি খুব সহজে বুঝতে পারবেন সে কি রকম, তার কি রকমের গান পছন্দ, সে কি রকমের খাদ্যভাষে অভস্থ্য, এবং সে কি প্রকৃতির মানুষ। আমি ফাও কথা বলছি না। এর পিছনে আমার একটা দুইটা না বরং ৩২ টি গুটির উপর ভিত্তি করে ৯ রকম লজিক, গুটির মুভমেন্টের উপর ভিত্তি করে ৮ রকম লজিক, সময় এবং গুটি কয়েক গুটির উপর ভালোবাসা ভিত্তি করে আরো ৩ ধরণের লজিক রয়েছে। সেগুলো এখন যদি বর্ণনা করা শুরু করি তাহলে সব লিখতে লিখতে সারা রাত পার হয়ে যাবে। তাই এ বিষয়ে আর কথা এগুতে চাচ্ছি না।
আচ্ছা দাবার বিষয়ে কথা পরে বলি, এখন একটা স্মৃতির কথা বার বার মাথায় আসছে… সে বিষয়ে লিখতে ইচ্ছে করছে…

আমি যখন ক্লাস সেভেনে কুমিল্লা জিলা স্কুলে পড়ি তখন আমার বাসা থেকে ‘সেলিম স্যার’ নামে একজন স্কুল শিক্ষক ঠিক করে আমার মা। সেই স্যারের দ্বায়িত্ব ছিল আমাকে মারতে মারতে অঙ্কের বই গিলানো। তিনি আমাদের বাসায় এসেও পড়াতো, আবার আমিও উনার বাসায় যেতাম পড়তে। দুই জায়গায় পড়তে গেলেও একটা জিনিস দুই জায়গাতেই একইরকম ছিল… আর তা হচ্ছে ‘মাইর’…তবে দুই জায়গায় দুই রকম ভাবে মাইর খেতাম আমি। স্যারের বাসায় মারতো মোটা জালি বেত দিয়ে (সাথে হাতের মাইর থাকতো), আর আমাদের বাসায় মারতো শুধু হাত দিয়ে। তবে মাইর কখনো মিস হতো না। আমি অবশ্য কান্নাকাটি, বা আঃ উঃ করতাম না। যত মাইরই খাই না কেন, মুখ দিয়ে কখনো আওয়াজ করতাম না। আর পাশাপাশি চেষ্টা করতাম যথাসম্ভব কান্না চেপে রাখার জন্য।

আপনাদের একটা জিনিস বলে রাখা ভালো, আমি কিন্তু মোটেও দুষ্ট স্বভাবের ছেলে ছিলাম না। আমি সারাদিন বাসাতেই ম্যাচের কাঠি, পিপড়া, ভাঙ্গা যন্ত্রপাতি দিয়ে নিজের মতো করে খেলতাম, কাউকে কখনো বিরক্ত করতাম না। মায়ের কাছে কাছে কখনোই টাকা চাইতাম না… চিপস কিনবা চকলেট খাওয়ার জন্য। আমাকে স্কুলে যাওয়া আসার জন্য ২০ টাকা দিত, আমি স্কুলে হেটে হেটে যেয়ে ১০ টাকা করে প্রতিদিন জমাতাম। এভাবে ২ তিন মাস জমানোর পর আমার মা আমাকে বলতেন, “টাকা পয়সা ছেলেমেয়েদের হাতে দেওয়া ঠিক না”, এই কথা বলে উনি সব টাকা নিয়ে যেতেন, তারপর ঐ টাকা থেকে দুই তিনটা চিপস আর কিছু চকলেট কিনে দিয়ে বাকি টাকা নিজের কাছে রেখে দিতেন। আর আমি তাতেই খুব খুশী হতাম। একসাথে তিন চারটা চিপস আর চকলেট তো খাইনি কোনোদিন, তাই আরকি।

আবার আমার কিন্তু কোনো বন্ধুও ছিল না। কারণ আমাকে আমার মা স্কুল বাদে কখনোই ১ মিনিটের জন্য বাহিরে থাকতে দেয়নি বা কারো সাথে মিশতে দেই নি। এমনকি বিকেল বেলাতেও বাসাতে থাকতাম… খেলতাম নিজের মতো করে। আর তা নিয়ে আমার কখনোই কোনো ক্ষোভ ছিল না। একটা কুয়োর ব্যাঙ যে কিনা আজীবণ কুয়োর ভিতরেই বাস করেছে, তার জানার কথা না বাহিরের দুনিয়ায় বিকেল বেলা কি হচ্ছে। তার কাছে কুয়াতেই স্বর্গবাস, কুয়াতেই নরকবাস।

আমার শুধু একটাই সমস্যা ছিলো… আর তা হচ্ছে আমি স্কুলের বেশীরভাগ পরিক্ষার বেশিরভাগ বিষয়ে ফেল করতাম। ইসলাম ধর্মে ফেল করতাম আরবী পারতাম না দেখে, সমাজ বিজ্ঞানে ফেল করতাম ইতিহাস জানি না দেখে, বাংলায় ফেল করতাম হাতের লেখা ভালো ছিলো না বলে, ইংলিশে ফেল করতাম বুঝতে সমস্যা হতো দেখে, আর গণিতে ফেল করতাম মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতাম না দেখে… বা বুঝার চেষ্টা করতাম না। আমার মন পরে থাকতো আমার ফেলে আসা শৈশব রাঙ্গামাটিতে, যেখানে ৫ কিমি এর বেশী পাহাড় পর্বতের রাস্তা পাড়ি দিয়ে স্কুল থেকে প্রতিদিন ফিরতাম বাসায়। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ফিরতাম বাসায়…. যেদিন রাঙ্গামাটি ছেড়ে কুমিল্লায় চলে যাচ্ছিলাম, সেদিনও বুঝতে পারিনি যে আমি কি হারাতে যাচ্ছিলাম…

কুমিল্লার ধুলা বালি মাখা সমতল ভূমি আমার মনটাই ভেঙ্গে দিয়েছিল একেবারে ভিতর থেকে… ফেল করতে লাগলাম প্রিতিটি শ্রেণীর প্রতিটি পরিক্ষায়… তাই আমার পিছনে আমার মা মাষ্টার লাগিয়ে রেখেছিল শুধুমাত্র আমাকে পড়া গিলিয়ে দেওয়ার জন্য। তারা বাসায় এসে আমাকে হা করিয়ে পড়া গিলানো শুরু করতো, কেউ গেলাতো আদর করে, কেউ গেলাতো শাসন করে.. এক একজন মাষ্টারের পড়া গিলানো ধরণ ছিলো এক এক রকম। ইসলাম শিক্ষার জন্য যে স্যারের কাছে পড়তাম, তিনি অত্যন্ত আদর করে পড়াতো। ৪ বছর উনার বাসায় যেয়ে পড়েছি কিন্তু তিনি একটা দিনও আমার গায়ে হাত তুলে নাই। আমি মাঝে মাঝে লজ্জা পেতাম ইসলাম শিক্ষায় ফেল করার পড়। ভাবতাম হজুর স্যার কে মুখ দেখাবো কিভাবে…

আর গরু যেভাবে পেটায়, সেলিম স্যার আমাকে সেভাবে মারতো। আমার আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে আত্মভিমান মারাত্বক রকমের ছিলো। হাত দিয়ে কেউ মারলে ইচ্ছে হতো মরে যেতে… তারপরও সেলিম স্যার প্রতিটা দিন আমার ঘাড়ে, মুখে, কানে…মাথায়… ইচ্ছা মতে মেরেছে হাত দিয়ে… কারণে অকারণে… মাঝে মাঝে শুধু শুধু…আস্তে আস্তে সেলিম স্যার আমার কাছে যমের মতো হয়ে গেলো, কিংবা জমের চাইতেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশী। সেলিম স্যারের সামনে ভয়ে আমি সোজা হয়ে দাড়াতে পারতাম না, হাটুগুলো ভেঙ্গে দাড়াতাম। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় এটা আমার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল… দাড়াতাম ঠিক একটা লুলার মতো… হাটু থেকে দুই পা ভেঙ্গে… এই জিনিসটা সেলিম স্যার খুব এনজয় করতো। মাঝে মাঝে অন্য স্যারেরা তার বাসায় বেড়াতে আসলে আমাকে বলতো উঠে দাঁড়ানোর জন্য। আমি উঠে দাড়াতাম। তারপর আমাকে তিনি বলতেন একটু দূরে যেয়ে দাঁড়ানোর জন্যে, যাতে করে উনি এবং উনার দর্শকেরা ভালোভাবে দেখতে পারে যে ‘আমি লুলাদের মতো হাটু ভেঙ্গে অদ্ভুতভাবে দাঁড়িয়ে আছি’… আমাকে এই রকম শুধু একবারই নয়… বার বার দাড়াতে হয়েছিল। এবং শুধু স্যারের বাসাতেই নয়… আমাদের নিজ বাসাতেও মাঝে মাঝে এভাবে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে কিছু দর্শকদেরকে মজা দেওয়া লাগতো। আর বেশীরভাগ সময় দর্শকদের মডারেটদের ভূমিকা আমার ‘মা’ পালন করতো। তিনি সেলিম স্যারকে অনুরোধ করতো, আমাকে দাড়াতে বলার জন্য। সেলিম স্যারও আমাকে দাড়াতে বলতো, আমিও দাঁড়াতাম, আর দর্শক সারির সবাই তা এনজয় করতো। এমনকি আমার মা ও !!!

সেলিম স্যারের মাইর দেওয়ার পছন্দের জায়গা ছিল ‘আমার মাথা’, আমার মাথায় তিনি একটু পর পর শুধু থাপ্পড় দিতো, পাশে দেয়াল থাকলে দেয়ালের সাথে বাড়ি লাগতো মাঝে মাঝে………………………………………………

আমি কয়দিন আগে স্নাতক পাশ করেছি। অনেকদিন হয়েছে কোনো স্যারদের হাতেও মার খাই না। কিন্তু এখনো যদি কেউ আমার মাথায় আদর করে হাত রাখে, আমার পুরো শরীর কেপে উঠে এক অজানা কারণে। ইচ্ছে করে যে হাত রেখেছে, তার হাত দুটো ভেঙ্গে ফেলতে…

আমি হয়তো কখনোই সেলিম স্যারকে আমার মাথা হতে তাড়াতে পারবো না। আমার হারানো শৈশবে যে বিষ আমার মা আর সেলিম স্যার আমার মাথায় গেঁথে দিয়েছে, সেই বিষ নিয়েই হয়তো আমাকে শেষ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে হবে…
এখনো আমার মাঝে মাঝে মাঝ রাতে চিৎকার করে করে ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমার বন্ধু রিজভী তখন আমাকে শান্ত করে আমার ভুল ভাঙ্গায় যে, আমি আমার স্বপ্নের মধ্যে ছিলাম… বাস্তবে না… আমিও আবার ঘুমের মধ্যে ঘুমিয়ে যাই। সে ও বুঝতে পারে এগুলা হচ্ছে আমার দুঃস্বপ্ন…কিন্তু সে বুঝতে পারে না আমি আমার স্বপ্নে কি দেখিছি… কেউ ই কখনো পারবে না… নিজের দুঃস্বপ্ন নিজেকেই আজীবণ লালন করতে হয়।
কিন্তু আমাকে বুঝতে হয় কে কিরকম। তাই আমিও মনে মনে ছক কেটে দাবা খেলি সবার সাথে… আমার পরিবারের লোকজনদের সাথে, আমার বন্ধুদের সাথে, বা আমার অফিসের কলিগদের সাথে। আমাকে বুঝতে হয় কেউ কি আবার সেলিম স্যারের মতো আমার ঘাড়ে অদৃশ্যভাবে থাপ্পড় দিয়ে আমাকে লুলা বানিয়ে দর্শকদের কাছ কাছ থেকে হাত তালি নিচ্ছে নাকি।  মাঝে মাঝে মনে হয় থাক করুক, হোক মাঝে মাঝে তার সেলিম স্যার। সেলিম স্যার হউয়ার মাঝেও আলাদা একটা পাশবিক মজা আছে। আমিও তো করি, আমিও তো হই…মাঝে মাঝে একজন ‘সেলিম স্যার’।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s